মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

০১। বিপিন চন্দ্র পাল(১৮৫৮-১৯৩২): ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বিশ্বের বাগ্মী নেতা বিপিন পাল ১৮৫৮ খ্রি. ৭ নভেম্বর হবিগঞ্জ সদর উপজেলার পৈল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেটের প্রাইজ স্কুল, হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্মতত্ত বিষয়ে লেখাপড়া করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৭৭ খ্রি. কলকাতায় শ্রীহট্ট সম্মিলনি স্থাপিত হয়। তিনি ১৮৮০ খ্রি. সিলেটের মুফতি স্কুলের ভগ্নাংশ নিয়ে সিলেট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয প্রতিষ্ঠা করে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৮০ খ্রি. প্রকাশ করেন সিলেটের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র পরিদর্শন। এছাড়া তিনি বেঙ্গল পাবলিক অপিনিয়ন, ট্রিবিউন, স্বরাজ, হিন্দু রিভিউ, সোনার বাংলা, ইনডিপেনডেন্ট, ডেমোক্রেট সহ অনেক পত্রিকায় সাংবাদিক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন অখন্ড ভারত আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। এছাড়া বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় লিখিত তাঁর ২৫ টিরও বেশী বই বিশ্বের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়। ১৯৩২ খ্রি. ২০ মে বিপিন পাল তাঁর জন্মস্থান হবিগঞ্জ জেলার পৈল গ্রামেই দেহত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু হবিগঞ্জে এসে এই বাগ্মী নেতার জন্ম ও মৃত্যু স্থান পৈল গ্রামে অনেকক্ষণ অবস্থান করেন এবং পৈলের মাটি সঙ্গে করে নিয়ে যান, যা আজও ভারতের দিল্লীস্থ ন্যাশনাল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

ক্ষেত্রে তিনি প্রথম শ্রেণী প্রাপ্ত হন। তিনি মার্কিন যুক্তরাজ্যের কার্নেগী ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি থেকে মাষ্টার্স অব ডক্টর অব সাইন্স ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী অর্জন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় মূলত বুয়েট প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি ছিলেন ভাইস চ্যান্সেলর। এছাড়া তিনি  বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা (মন্ত্রীর মর্যাদায়), পি এস স’র চেয়ারম্যান, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের সভাপতিসহ অনেক জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। জাতির প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ সেবার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৬ খ্রি. ড. আব্দুর রশিদ চৌধূরীকে সিতারা-ই-পাকিস্তান খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি লন্ডনস্থ কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পদেও নির্বাচিত হন কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই ১৯৮১ খ্রি. ৬ নভেম্বর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর রহস্য আজও উদঘাটিত হয়নি। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ বুয়েটে ড. এম এ রশিদ হল প্রতিষ্ঠা করা হয়।

 

০২। সৈয়দ এ. বি. মাহমুদ হুসেন (১৯১৬-১৯৮২): সৈয়দ আবুল বাসার মাহমুদ হুসেন ১৯১৬ খ্রি. হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার লস্করপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল, সিলেট এম সি কলেজ, কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ঢাকা দারুল উলুম আহসানিয়া মাদ্রাসার প্রধান হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৩০ খ্রি. হবিগঞ্জ বারে যোগদানের মাধ্যমে জড়িত হয়ে পড়েন আইন পেশায়। ১৯৪৩-৪৮খ্রি. পর্যন্ত এপিপি’র দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৪৪-৪৭ খ্রি. আসাম প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের কাউন্সিলার, ১৯৪৫-৪৭ খ্রি. নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলর, ১৯৪৭-৫৫ খ্রি. নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিলর ছাড়াও পাকিস্তান ও সিলেট রেফারেন্ডাম আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। কর্ম জীবনে তিনি ১৯৫১ খ্রি. ফেডারেল কোর্ট অব পাকিস্তানের এটর্নি, ১৯৫৮ খ্রি. পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট পরে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত এডভোকেট জেনারেল, ১৯৬৫খ্রিঃ তিনি পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের এপিলেট ডিভিশনের বিচারপতি নিযুক্ত হন। ১৯৭৫-৭৮ খ্রি. পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের চেয়ারম্যান, হবিগঞ্জ লোকাল বোর্ডের সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্য, পাকিস্তান চা বোর্ডের সদস্য, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের উপদেষ্টা, পাকিস্তান শরণার্থী পূনর্বাসন কর্পোরেশনের পরিচালক, পাকিস্তান কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বেলীর সদস্য, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারী এসোসিয়েশনের সদস্য, আন্তপার্লামেন্টারী ইউনিয়নের সদস্য, আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের প্রেসিডেন্ট, সেন্টাল ল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, শেফ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর পেট্রন, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এ মহান পুরুষ ১৯৮২ খ্রি. ২ আগস্ট ইন্তেকাল করেন।

০৩। উম্মে আয়েশা খাতুন চৌধুরী: উম্মে আয়েশা খাতুন চৌধুরী হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার দরিয়াপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা এমসি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রব চৌধুরী। উম্মে আয়েশা খাতুন চৌধুরী কলকাতা লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে অধ্যয়ন করেন। তিনি ১৯৫১ খ্রি. ফরিদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নিযুক্ত হয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। ১৯৫২ খ্রি. লসিংটরে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম এস ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৪ খ্রি. বরিশাল অঞ্চলে সহকারী স্কুল পরিদর্শক ও ১৯৫৭ খ্রি. দ্বিতীয়বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন সার্ভিস এডুকেশন ট্রেনিং গ্রহণ করে ১৯৬০ খ্রি. ঢাকা এডুকেশন সেন্টারের বিশেষ পদে যোগদান করেন। তিনি পরপর ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের স্কুল পরিদর্শক ছিলেন। ১৯৭৬ খ্রি. তিনি প্রথম মহিলা হিসেবে জনশিক্ষা উপ-পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৮-৮১ খ্রি. পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। উল্লেখ্য, কোন শিক্ষা বোর্ডে প্রথম মহিলা চেয়ারম্যান হলেন তিনি। শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রথম মহিলা পরিচালকও তিনিই। তিনি গার্লস গাইড এসোসিয়েশনের কমিশনার ও চেয়ারম্যান ছিলেন। মিশুক, স্নেহময়ী ও পরোপকারী মানসিকতাসম্পন্ন এই চিরকুমারী নারী ২০০২ খ্রি. ৩ জানুয়ারি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন ।

০৪। এম. এ. মোত্তালিব (১৯৪১-১৯৯৪): এম. এ. মোত্তালিব ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে হবিগঞ্জ শহর সংলগ্ন সুলতান মাহমুদপুর গ্রামে সাধারণ গৃহস্থ পরিবারে জম্ম গ্রহণ করেন। তিনি হবিগঞ্জ হাইস্কুলে বাল্যকালে শিক্ষা লাভ করেন। সাবেক পাকিস্তান নৌ-বাহিনীতে বয়েজ ক্যাডেটে যোগদানের জন্যে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষার পুর্বেই হাইস্কুল ত্যাগ করেন। কিন্ত নৌ-বাহিনীতে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের বয়েজ ক্যাডেটদের কমিশন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই দেখে তিনি ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় মাধ্যমিক শিক্ষাত্তোর কারিগরী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং সাবেক পাকিস্তান কারিগরি প্রশিক্ষণ বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের মাঝে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেন। পরে লৌহ শিল্প ও কারিগরী সহযোগিতা কেন্দ্রে বিশেষ ট্রেনিং সমাপ্তির পর ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে টেকনেশিয়ান হিসেবে চাকুরী গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি জয়দেবপুরস্থ বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক ইউনিয়ন ও জয়দেবপুর ডিজেল প্ল্যান্ট শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করেন। এম এ মোত্তালিব ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মার্চ পর্যন্ত এলাকা মুক্ত রাখতে সক্ষম হন ও পরে মুক্তি বাহিনীর ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরের আওতায় বি. আই. ডি. সি গেরিলা ইউনিট গঠন করেন এবং এর কমান্ডার হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় নেতৃত্বদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দেশ বিদেশের পত্রপত্রিকা, বেতার ও টেলিভিশনে এম. এ. মোত্তালিবের বিভিন্ন বক্তব্য বিবৃতি প্রচারিত হয়। যুক্তরাজ্য অবস্থানকালে এম. এ. মোত্তালিব ওয়ার্ক ওপেন ইউনিভারসিটি, গোল্ডস্মিট কলেজ অব এডুকেশন এবং লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজে সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, ইংরেজী, অর্থনীতি ও ইতিহাস শাস্ত্রে  ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তখনি তিনি যুক্তরাজ্যে রেইস রিলেশন ইনস্টিটিউট, ট্রাই কন্টিনেন্টাল লিভারেশন ইনস্টিটিউট, এশিয়ান সোশালিস্ট ফোরাম, অল রীড এগেইন্স্ট ইমপেরিয়েলিজম, পুর্বাঞ্চলীয় প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের সমিতি ও জার্নাল অব কনটেমপরারী এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ কনফেডারেশনের সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিকের নেতা গণ্য হয়ে জাতিসংঘের অন্যতম এজেন্সি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে টেক্সটাইল কমিটির পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব সম্মেলনের ডেলিগেট হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। ঐ সম্মেলনেই বাংলাদেশ আইএলও এর গভর্নিং বডিতে সদস্য নির্বাচিত হয়। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন।  জনাব এম. এ. মোত্তালিব ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন শ্রীমঙ্গলে মৃত্যুবরণ করেন।